বর্ষা মৌসুম প্রায় শেষ। তবুও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেল না খুলনার মানুষ। এ দুর্ভোগ থেকে রক্ষার জন্য ৮০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খুলনা মহানগরীর যে ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির পানি চলে যাওয়ার কথা সেই ড্রেন উছলিয়ে ময়লা-আবর্জনা শহরকে কুৎসিত করছে। অভিযোগ উঠেছে, যেনতেন ফিজিবিলিটি স্টাডি ও ভুল নকশায় রাস্তা-ড্রেন উঁচু করায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ড্রেনের তলদেশ মূল রাস্তার চেয়ে উঁচু থাকায় পানি নামতে পারছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন ৮২৩ কোটি টাকার ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। এতে ৯টি খাল খনন, একটি পাম্প হাউস, ৮টি স্লুইস গেট, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ড্রেন নির্মাণ, আউটলেট খনন করার কথা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু আশানুরূপ ফল পায়নি নগরবাসী। বৃষ্টি নামলেই রাজপথে দেখা যায় পানির স্রোত।
প্রসঙ্গত, ৮২৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পে নকশা তৈরিতে কারিগরি সহায়তায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছিল ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্টস লিমিটেড (ডিডিসি) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) সুপারভিশনের কাজ করে।
বিপুল এ অর্থ ব্যয় করেও নগরের জলজট না কমার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো-প্রথমত খুলনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান ৩০ থেকে ৬০ ফুট চওড়া ২২টি প্রাকৃতিক খালকে সরু কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা, অপরিকল্পিত নগরায়ণে জলাধার-পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা এবং পানি নিষ্কাশনে ড্রেনগুলোর তলদেশে সঠিক ঢাল বজায় না রেখে রাস্তা-ড্রেন তিন থেকে চার ফুট উঁচু করাই মূলত দায়ী। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সম্পাদক কুদরত-ই খুদা বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্প এখন সিটি করপোরেশনের গলার কাঁটা। ত্রুটিপূর্ণ নকশায় সড়ক-ড্রেন উঁচু করায় শহরের হাজার হাজার বাড়িঘর ড্রেনের উচ্চতার তুলনায় নিচে চলে গেছে। প্রকল্প সুপারভিশন কাজে যুক্ত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান আলী বলেন, সার্ভে ডিজাইন করার সময় সমুদ্র পৃষ্ঠের পানির উচ্চতার রিডিউস লেভেল (আরএল) মেথডে শহরের বিভিন্ন স্থানে বেঞ্চমার্ক তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কোথাও কোথাও রাস্তা-ড্রেন উঁচু করা হয়। তিনি বলেন, মুজগুন্নি এলাকার রাস্তা ওয়াটার লেভেলের নিচে, বৃষ্টিতে সেখানে পানি জমে রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। তাহলে উপায় কি? রাস্তা উঁচু করতে হবে। আর রাস্তা উঁচু হলে সারাউন্ডিং এরিয়া ডুবে যাবে-এটাই স্বাভাবিক। তবে অধ্যাপক ড. শাহজাহান আলী দাবি করেন, প্রকল্পে বড় সমস্যা এর ফিজিবিলিটি স্টাডিতে স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। কোথা থেকে কী পরিমাণ পানি কোথায় নেওয়া হবে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে তা ছিল না। আমাদেরকে আগে থেকে কত কিলোমিটার ড্রেন কত টাকায় কোথায় নির্মাণ করা হবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ডিজাইনে হ্যাম্পার করে আমাদের মতো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডিজাইনে চওড়া খাল ও ড্রেন সরু করে পানির ধারণ ক্ষমতা কমানো হয়েছে। সড়ক ও ড্রেনের বেড উঁচু করা হয়েছে। এত উঁচু করে ড্রেন করার প্রয়োজন ছিল না। শহরের মধ্য দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ২২টি প্রধান খাল ছিল। সেই খালগুলোকে সামনে রেখে ডিজাইন করা উচিত ছিল। পানি স্বাভাবিকভাবে ঢালুতে নামবে। কিন্তু যেখানে ঢালু সেখানে রাস্তা উঁচু করা হয়েছে। ফলে পানি বের হতে পারছে না।
0 Comments
Your Comment